ওয়াসিম হোসেন: ধামরাই
উপমহাদেশে বৃহত্তর ও দেশের ঐতিহ্যবাহী যশোমাধব দেবের রথযাত্রা ঘিরে প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রথযাত্রা উৎসব উৎযাপনে এরইমধ্যে রং তুলির আঁচড়ে প্রস্তত করা হয়েছে। এই ঐতিহ্যবাহী রথ।
বুধবার ( ১৫জুলাই) সকালে ধামরাই বাজারে গিয়ে দেখা যায় রংশিল্পীরা রথ সাজানোর কাজ শেষ করেছেন।রথযাত্রা উপলক্ষে সাজসজ্জার কার্যক্রম হয়েছে বলে জানান আয়োজকরা।
জানা যায়, ৪০০ বছর আগের কথা। ধামরাইয়ের জমিদার ছিলেন শ্রী যশোপাল। নিজের সৈন্য সামন্ত নিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন পাশের এলাকায়। বন-জঙ্গলে ঘেরা পথে চলতে গিয়ে এক ঢিবির সামনে হঠাৎ থেমে যায় তার হাতি। হাতি আর এগোয় না। উপায় না পেয়ে সেই ঢিবি খননের নির্দেশ দেন রাজা। খননের পর ঢিবির নিচ থেকে পাওয়া যায় এক মন্দির ও কিছু মূর্তি।
ভক্তি করে সেসব মুর্তি বাড়ি আনেন রাজা। রাতেই স্বপ্নে দেখেন মাধব দেবতাকে। তিনি রাজাকে নির্দেশ দেন পূজা করার ও নিজের সঙ্গে মাধব নাম বসিয়ে নেওয়ার। যশোপালের নাম হয়ে যায় যশোমাধব। সময়টি ছিল চন্দ্র আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় তিথি। সেই থেকে শুরু হয় যশোমাধবের পূজা ও রথযাত্রা। প্রতিবছরের মতো এবারও রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এজন্য চলছে রথের সাজসজ্জার কার্যক্রম।

তারা আরও জানান, বাংলা ১২০৪ থেকে ১৩৪৪ সন পর্যন্ত ঢাকা জেলার সাটুরিয়া থানার বালিয়াটির জমিদাররা বংশানুক্রমে এখানে চারটি রথ তৈরি করেন। ১৩৪৪ সালে রথের ঠিকাদার ছিলেন নারায়ণগঞ্জের স্বর্গীয় সূর্যনারায়ণ সাহা। এ রথ তৈরি করতে সময় লাগে এক বছর।
ধামরাই, কালিয়াকৈর, সাটুরিয়া, সিঙ্গাইর থানার বিভিন্ন কাঠশিল্পী যৌথভাবে নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ করে ৬০ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন রথটি তৈরি করেন। এ রথটি ত্রিতলবিশিষ্ট ছিল, যার প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় চার কোণে চারটি প্রকোষ্ঠ ও তৃতীয় তলায় একটি প্রকোষ্ঠ ছিল। বালিয়াটির জমিদাররা চলে যাওয়ার পর রথের দেখভালের দায়িত্ব পালন করত টাঙ্গাইলের রণদাপ্রসাদ সাহার পরিবার।
২০১০ সালে ধামরাইয়ে পুরোনো রথটির আদলে দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন রথ বানিয়ে দেওয়া হয়। ৪০ জন শিল্পী ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে নিরলসভাবে কাজ করে ৩৭ ফুট উচ্চতা ও ২০ ফুট প্রস্থের কারুকার্যখচিত নতুন রথটি নির্মাণ করেন।লোহার খাঁচার ওপর সেগুন ও চাম্বল কাঠ বসিয়ে খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে আকর্ষণীয় সব শৈল্পিক নিদর্শন। এতে রয়েছে লোহার তৈরি ১৫টি চাকা। রথের সামনে রয়েছে কাঠের তৈরি দুটি ঘোড়া ও সারথি।
এ ছাড়া রথের বিভিন্ন ধাপে প্রকোষ্ঠের মাঝে স্থাপন করা হয়েছে কাঠের তৈরি দেব-দেবীর মূর্তি। প্রতি বছর রথযাত্রার আগে রং চরানো ও সাজসজ্জার কাজ করে এটিতেই অনুষ্ঠিত হয় রথ উৎসব।
রথের দেখভালের দায়িত্বে থাকা দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানান, রথটি সারা বছর বাইরে খোলা আকাশের নিচে রাখা হয়। এ জন্য রং মলিন হয়ে যায়। কিন্তু রথযাত্রার আগে এটিকে পুরোপুরি সাজিয়ে তোলা হয়। এছাড়া সংস্কারের কাজকর্মও এই সময়ে করা হয়।
আয়োজকরা জানান, প্রায় ৪০০ বছর ধরে শ্রী যশোমাধবের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ বছরও আগামী ১৬ জুলাই রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। উল্টোরথের মাধ্যমে রথযাত্রার ইতি ঘটবে ২৪ জুলাই।
মহাদেব ঢালী নামে এক রংশিল্পী বলেন,গত ৩৫ বছর ধরে রথের সাজসজ্জার কাজ করে আসছি। এ বছরও গত কয়েকদিন ধরে এখানে রথ সাজানোর কাজ করছি।রথের রংঙের কাজ শেষ হয়েছে।
চন্দন রায় নামে আরেক রংশিল্পী বলেন, রথের খুঁটি, দেবতাদের প্রতিকৃতিসহ সব রং করা হয়েছে।
রথযাত্রার সর্বশেষ প্রস্তুতির বিষয়ে ধামরাই যশোমাধব মন্দির পরিচালনা পরিষদের সহ-সভাপতি নন্দ গোপাল সেন বলেন, রথযাত্রা ও রথমেলা উপলক্ষে রথের সাজসজ্জা ও পরিচর্যার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। রঙের কাজ ও শেষ। অন্যান্য বাকি কাজও দ্রুত শেষ হবে। এরপর রথটান হবে। এ ছাড়া মাসব্যাপী মেলা হবে। এরমধ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
এবিষয়ে ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হুদা খান বলেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বড় উৎসব রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার সকল প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব জায়গায় পুলিশ মোতায়েন করা থাকবে। আমরা নিশ্ছিদ্রভাবে রথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃআল মামুন বলেন,রথযাত্রা উৎসব নির্বিঘ্ন করতে রথ উদযাপন কমিটির সাথে নিরাপত্তা বিষয়ক সভা করা হয়েছে। সেই সাথে রথযাত্রা উপলক্ষে বাড়তি নিরাপত্তার জন্য পোশাকে ৩শ পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও বিভিন্ন পর্যায়ের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করবে।

