শনিবার

২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরিরামপুরে সোহেল রানার কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার বয়রা ইউনিয়নের আন্দারমানিক গ্রামের সোহেল রানার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মিথ্যা মামলা, মারধর, জমি দখল ও সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে অসদাচরণের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোহেল রানা নিজেকে এনসিপির অঙ্গসংগঠন শ্রমিক উইংয়ের মানিকগঞ্জ জেলা প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন সময় সাধারণ মানুষ ও সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে আসছেন। যদিও তার এই পদবী বা দায়িত্ব সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ মেলেনি।

অভিযোগ রয়েছে, সোহেল রানা দৃশ্যমান কোনো পেশার সাথে জড়িত নন। এলাকাবাসীর ধারণা, তিনি মাদক সেবন ও বিক্রির সাথেও যুক্ত থাকতে পারেন।

৫ আগস্টের পর থেকে সোহেল রানা হরিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, প্রাণিসম্পদ অফিস, সমাজসেবা অফিস ও এসিল্যান্ড অফিসের কর্মকর্তাদের সাথে অসদাচরণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সমাজসেবা অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সোহেল রানার এসব আচরণে আমরা অতিষ্ঠ। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট পাঠানো হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।”

এদিকে স্থানীয় এলাকাবাসী সোহেল রানার অপকর্মের প্রতিবাদে গত ৭ আগস্ট উপজেলা প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেন। একইসঙ্গে কয়েকশো মানুষের স্বাক্ষরযুক্ত একটি গণপিটিশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দেন। তবে এ ঘটনার পর ক্ষিপ্ত হয়ে সোহেল রানা মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দায়ের করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সোহেল রানা শুধু এলাকাবাসী নয়, নিজের আত্মীয়দের সাথেও বিরোধে জড়িয়েছেন। তার বড় ভাই হুমায়ুন কবির ও এক ফুপু খায়রুনের জমি দখল করে রেখেছেন দীর্ঘদিন ধরে। তাদেরকে দীর্ঘদিন ধরে মামলা দিয়ে হয়রানি ও বড় ভাইয়ের স্ত্রী সাফিয়াকেও মারধর করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগীরা ইতোমধ্যে হরিরামপুর থানায় একাধিক অভিযোগ দায়ের করেছেন। তবে পুলিশ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা হতাশা প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাব ও আতঙ্কের কারণে অনেকে মুখ খুলতেও সাহস পান না। ফলে প্রশাসনিক পদক্ষেপ না এলে সোহেল রানার দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে না বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।

সোহেল রানার বড় ভাই হুমায়ুন কবির বলেন, সোহেল রানা আমার জমি দখল করে রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে এবং আমাকে এই এলাকা ছাড়া করা ও হত্যার হুমকি দিচ্ছে সে। কয়েকটি মামলা দিয়েছে আমার বিরুদ্ধে এবং আমার স্ত্রীকেও মারধর করেছে। আমি এখন খুবই আতঙ্কে আছি।

হুমায়ুন কবিরের স্ত্রী সাফিয়া বলেন, সোহেল রানা আমাদের উপরে অনেক অত্যাচার করছে। সে একের পর এক মামলা দিয়েই যাচ্ছে। তিনটি মামলা খারিজ হয়েছে একটি এখনো চলমান রয়েছে। এর আগে আমাকেও মারছে এবং আমার মেয়েদের বিয়ে ও সে ভেঙে দেয়। আমার স্বামী ঢাকায় থাকে আমি এখন খুবই আতঙ্কে আছি।

আরেক ভুক্তভোগী লিটন বলেন, সোহেল ৫ ই আগস্টের পর আমার কাছ থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে। এত টাকা আমার পক্ষে দেয়া সম্ভব না। তাই আমি স্থানীয়দের সাথে উপজেলা প্রাঙ্গণে মানববন্ধনে অংশ নেই সোহেল রানার বিরুদ্ধে। সে এই খবর শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে আমার নামেও মামলা দিয়েছে।

সোহেল রানার এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে মামলায় ফেঁসে গেছেন আরেক ভুক্তভোগী শামীম হোসেন। তিনি জানান, সোহেল রানা ৫ ই আগস্টের পর থেকে সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের হয়রানি করে চলেছে। এরই প্রতিবাদে আমরা মানববন্ধন করলে সে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। সোহেল রানা যে মামলা করেছে তার এক পারসেন্টও সত্যতা নাই।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত সোহেল রানা বলেন, আমি ২৪ শে জুলাই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন করেছি। আমি আমার বিবেকের তাড়না থেকে বিভিন্ন অন্যায় অনিয়ম এবং সামাজিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে সেবা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নিজের জায়গা থেকে সোচ্চার হই। গত ২২ শে অক্টোবর সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি এবং ২৭ জানুয়ারি হরিরামপুর সহকারী কমিশনার ভূমি এর কাছে গিয়ে বেপরোয়াভাবে সীমানার বাইরে থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তলোন করার প্রতিবাদ জানাই।

এই সমস্ত প্রতিবাদ করার কারণে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আর আমার ভাই এবং ফুফুর সাথে জমি নিয়ে অনেক আগে থেকেই দেওয়ানী মামলা চলমান রয়েছে। আমার সাথে তারা মামলায় না পেরে তারাও ষড়যন্ত্র করছে আমার বিরুদ্ধে।

এবিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (টিএসও) ডা: কাজী এ,কে,এম রাসেল বলেন, সোহেল রানা সম্বনয়ক পরিচয়ে বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালে এসে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খবরদারি করে ও স্টাফদের সাথে অসদাচরণ করে। এর আগে হাসপাতাল চত্বরে বাহিরের লোক নিয়ে বিক্ষোভও করেছে। এতে আমাদের স্বাস্থ্যসেবায় ব্যাহত হয়।

এ ব্যাপারে এনসিপির মানিকগঞ্জ জেলা শাখার প্রধান সমন্বয়কারী জাহিদ তালুকদার বলেন, সোহেল রানা শ্রমিক উইংয়ের যে পরিচয় দেয় তার সাথে মানিকগঞ্জ জেলা এনসিপির কোন সম্পৃক্ততা নাই। কারন সে মূলত খেলাফত মজলিস করে। সে একজন অনুপ্রবেশকারী। ইতিমধ্যেই শ্রমিক উইং ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে।

এবিষয়ে হরিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবর রহমান বলেন, সোহেল রানার ব্যাপারে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। ঘটনা যদি সত্যি হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ