ড. ফোরকান আলী
সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা ও সমাজিক কাঠামো না থাকার জন্যই তরুণরা আজ মাদক সেবন করছে। সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা যদি থাকতো, তাহলে আজ আর মাদকাসক্ত বা মাদক সেবনকারী বিষয়টি আসতো না। তরুণ বা যুবকদের আজ বিপথগামিতার কারণ যদি চিহ্নিত করতে যাই, তাহলে বলতে হয় সামাজিক নিয়ম-নীতির বৈষম্য। স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও বৈষম্যের হার কিন্তু কমছে না বরং বাড়ছে। এজন্য এ সমাজের তরুণরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। বলতে গেলে, প্রথমত নৈতিক শিক্ষার অভাব ও মাদকদ্রব্যের সহজপ্রাপ্তি। ফলে উঠতি বয়সের যুবকরা মাদক সেবনে আগ্রহী হয়ে উঠছে। শুধু তা-ই নয়, সারাদেশেই অভাবী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এসব অভাবী পরিবারের সন্তানরা লেখাপড়া শেষ করে উচ্চশিক্ষিত হয়ে যখন ঘরে বসে থাকেন; তখন বেকারত্বের অভিশাপ তাদের বিষফোঁড়ার মতো হয়ে দাঁড়ায়। তখন এসব যুবক সবকিছু ভুলে থাকতে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। এ ছাড়া অসৎ সঙ্গ ও পারিবারিক বিড়ম্বনাও অনেকাংশে দায়ী।
এ ভয়ংকর থাবা থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজতে হবে। পিতা-মাতার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকেও সজাগ থাকতে হবে। কারণ তরুণরা নেশায় আক্রান্ত হওয়ার প্রথম কারণ হচ্ছে খারাপ সঙ্গ। কারণ প্রচলিত প্রবাদেই রয়েছে: ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’। এ ছাড়া দ্বিতীয় যে কারণটি, তা হচ্ছে পারিবারিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব না থাকা। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, একটি পরিবারের মধ্যে কোনো তরুণ ছেলের সঙ্গে মনোমালিন্যের ঘটনা ঘটলেই বিভিন্ন প্রকার মাদক সেবন করে মনের অস্থিরতা দূর করার চেষ্টা করে। তবে এর শুরু হয় স্বাভাবিকভাবে নেওয়া ২-৩ টাকার সিগারেট থেকে। এভাবেই এক সময় তরুণরা ধীরে-ধীরে ঝুঁকে পড়ে মাদক সেবনে। এ ছাড়া সন্তানদের হাতে অতিরিক্ত টাকা তুলে দেওয়ার ফলে উচ্চাভিলাষী সন্তানরা মাদক গ্রহণ করার প্রয়াস পায়। এর জন্য দায়ী অসচেতন পরিবারের কর্তারা।
যেহেতু আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যা ১৮ কোটির ঊর্ধ্বে। তার মধ্যে তরুণ-তরুণী অর্ধেক ধরে নিলে দাঁড়ায় প্রায় ৯ কোটি। এ এক বিপুল জনগোষ্ঠী। এর সঙ্গে আমাদের দেশের উন্নয়ন তো বটেই পাশাপাশি জনগণের আর্থিক উন্নয়নও জড়িত বলে মনে করি। অতীব দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এই বিপুল জনগোষ্ঠীর যখন লেখাপড়া, খেলাধুলা এবং উন্নত চিন্তায় বিভোর থাকার কথা; তখন সেখানে দেখি কালো মেঘের নির্মম গর্জন। এ কালো মেঘে বৃষ্টি হয় না, শুধুই ঝড় বইয়ে দেয়। ফলে উঠতি সব সুন্দর এবং মানসম্পন্ন চিন্তা-চেতনা ধুলায় লুণ্ঠিত হয়। তরুণ সমাজ আমাদের ভবিষ্যৎ বলেই বলছি না, বলছি বর্তমান প্রজন্ম হিসেবেও এরা যদি ‘নেশা নামক বিষবৃক্ষ’ থেকে মুক্তি না পায়। তবে আমাদের সব সম্ভাবনার সোনার তরী ডুবে যাবে অথৈ সাগরে।
প্রশ্ন উঠেছে, কেন তরুণরা নেশাগ্রস্ত হয়? তরুণদের নেশাগ্রস্ত হওয়ার পেছনে অনেক কারণ নিহিত। তার মধ্যে প্রধানত তাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে আমরা গুরুজনরা ব্যর্থ। অন্যদিকে লেখাপড়ার যে মান বর্তমানে দেশে চলছে তা-ও তরুণদের উন্নত চেতনা সৃষ্টিতে যথাযথ ভূমিকা রাখছে না। আমরা সরাসরি বলতে চাই, লেখাপড়ার যে ব্যয়ভার তা অভিভাবক শ্রেণি চালাতে ব্যর্থ হয়। ছাত্রছাত্রীরা সঠিকভাবে চলতে পারে না। তাদের বন্ধু-বান্ধবরা ভালো নেই, শিক্ষক শ্রেণি উন্নত চিন্তারও ধারক নন। এখন কথা হলো, যখন তরুণদের বিনোদনের ব্যবস্থা হিসেবে খেলাধুলা দেওয়া দরকার ছিল; তখন তা আমরা দিতে পারিনি। ফলে তারা অন্ধকারময় খাবার ইয়াবা, ফেনসিডিল, মদ, তাড়ি, ভাং, জুয়া প্রভৃতিতে আকৃষ্ট হয়েছে। এ পথ থেকে আমরা তাদের ফেরাতেও সুন্দর কোনো পথ দেখাতে পারিনি।
তরুণদের অতিরিক্ত টিভিপ্রেম, কম্পিউটার, মোবাইল ঝোঁক, পর্নো ছবির প্রতি আকর্ষণ আমাদের ভয়ার্ত করে। ইদানীং লক্ষ্য করছি, শহরে যে ধরনের অন্যায় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে; সে ধরনের কর্মকাণ্ড গ্রামেও নিত্যদিন ঘটে চলে, যা আদৌ কাম্য নয়। ইভটিজিং শুধু শহরে শুনতাম, এখন গাঁয়েও ঘটছে; যা থেকে বাঁচতে আমাদের বোনরা আত্মাহুতি দিচ্ছে, যা আমাদের দারুণভাবে আহত করে। তরুণদের নেশার জগৎ থেকে ফেরাতে প্রথমত প্রশাসনকে খুবই কঠিন হাতে সব ধরনের অপরাধ দমন করতে হবে। অন্যায়কারী যে-ই হোক, তাকে কোনো অবস্থায়ই ছাড় দেওয়া যাবে না। ইয়াবা ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য যাতে সীমান্ত পার হয়ে আসতে না পারে, তার প্রতি যথেষ্ট শক্তিশালী নজর রাখতে হবে।
সূত্রঃ জাগো নিউজ।

