মঙ্গলবার

১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাটুরিয়া ফেরিঘাট: ভাঙন-স্রোতে বিপর্যস্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথ। প্রতিদিন এ পথে দেড় থেকে দুই হাজার যানবাহন এবং কয়েক হাজার যাত্রী পারাপার হয়।

পদ্মা সেতু চালুর পর চাপ কিছুটা কমলেও, নৌপথটির কৌশলগত গুরুত্ব এখনো কমেনি। তবে বর্ষা এলেই তীব্র স্রোত আর ভাঙনে একের পর এক সংকটে পড়ছে ফেরিঘাটগুলো। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে এই ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে ঠেকানো যেত।

২০০২ সালে আরিচা থেকে স্থানান্তর করে পাটুরিয়ায় নির্মাণ করা হয় ফেরিঘাটগুলো। তখন থেকেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের প্রধান ভরসা হয়ে ওঠে এই নৌপথ। কিন্তু এবারের বর্ষায় পরিস্থিতি ভয়াবহ। চলতি মাসের ৫ তারিখে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে পাটুরিয়ার লঞ্চঘাট। শুধু তাই নয়, ভাঙনে নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে আশপাশের পাঁচটি ঘরবাড়ি ও একটি মুরগির খামার।

সবচেয়ে বেশি হুমকিতে আছে ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ফেরিঘাট। গত দুই সপ্তাহে একাধিকবার ডুবে গেছে এসব ঘাটের র্যাম্প। ফলে প্রতিদিন গাড়ি ওঠানামায় তৈরি হচ্ছে দুর্ভোগ। বিআইডব্লিউটিএ বাধ্য হচ্ছে ঘন ঘন জরুরি মেরামতে নামতে।

স্থানীয়রা বলছেন, গত দুই দশকে এমন ভাঙন দেখা যায়নি। অথচ এবার ভাঙনের তীব্রতা আগেভাগেই অনুমান করা যেত। বিআইডব্লিউটিএ যদি আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিত, ঘন ঘন জরুরি মেরামতের দরকার হতো না। এর ফলে ঘাটের রক্ষনাবেক্ষণ খরচ কমত এবং যাত্রী-ব্যবসায়ীদেরও দুর্ভোগ কম হতো।

পাটুরিয়া ঘাট এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মমতাজ বেগম বলেন, ‘আমরা অনেকগুলো পরিবার পাটুরিয়া ৫ নম্বর ফেরি ঘাটের কাছে নদীপাড়ে বসবাস করছি। গত শুক্রবার (১৫ আগস্ট) মাঝরাতে আমাদের বাড়িঘর নদীতে চলে গেছে। আমার আশপাশের আরো চারটি ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। আমার স্বামী, তিন ছেলে ও তাদের বউ-বাচ্চা মিলে পরিবারে ১২ জন সদস্য। কোনোমতো দিনমজুরি খেটে আমাদের সংসার চলে। এখন আমরা কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেব।’

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা রানা জানান, ‘আমরা ঘাটের স্থায়ী বাসিন্দা। এই তিন সপ্তাহের ভাঙনে লঞ্চঘাট, ঘাট এলাকার পাঁচটি বাড়ি একটি মুরগীর খামার নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আগে থেকে বিআইডব্লিউটিএ কোন সুরক্ষা ব্যবস্থা নেয়নি। এভাবে ভাঙন অব্যাহত থাকলে ফেরিঘাট বিলীন হতে সময় লাগবে না।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, ‘ফেরিঘাট এলাকা আমাদের আওতায়ভুক্ত না থাকায় সেখানে আমরা কাজ করতে পারছি না। তবে জেলা অভ্যন্তরে পদ্মা ও যমুনা নদীসহ অভ্যন্তরীন নদীগুলোর ভাঙনরোধে কাজ করে যাচ্ছি।’

বিআইডব্লিউটিএ-র আরিচা নদীবন্দরের নির্বাহী প্রকৌশলী নেপাল চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘পাটুরিয়া এমন ভাঙন বিগত দুই দশকে হয়নি। প্রচুর স্রোতের কারণে প্রতিটি ঘাটই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। আমরা এখন ঘাট রক্ষার্থে নিয়মিত জিও ব্যাগ ফেলছি। আর এ বিষয়ে মন্ত্রনালয়কে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডকেও জানানো হয়েছে। সিদ্ধান্ত আসলেই বৃহত কাজগুলো শুরু করা হবে।’

বিআইডব্লিউটিসি’র আরিচা কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম আব্দুস সালাম বলেন, প্রতিদিনই কোনো না কোনো ঘাট ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তারপরও জনস্বার্থে মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে আমরা ফেরি সার্ভিস চালু রেখেছি। তবে নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে ফেরি পারাপারে আগের চেয়ে দ্বিগুণ সময় লাগছে। এরই মধ্যে আমরা প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার ছোট-বড় যানবাহন পারাপার করছি।

তিনি আরও বলেন, ‘তীব্র স্রোত ও ভাঙনের মধ্যেও ফেরি সার্ভিস সচল রাখা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘাট এলাকায় নিয়মিত মেরামতের কাজ চলছে। তবে স্থায়ী সমাধান না হলে পাটুরিয়া ফেরিঘাট হুমকির মুখে পড়বে।’

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ